Skip to main content

আনিসের অঘটন



আনিস তার ঘরে আবদ্ধ। কেউ আটকে রাখেনি, নিজেই ঘাপটি মেরে আছে। আপাতত এ ছাড়া উপায় নেই। ঘরের বাইরে খাবার টেবিলে পরিস্থিতি গরম। আনিসের বাবা এমাজউদ্দীন সাহেব প্রচন্ড ক্ষেপে আছেন। ক্ষেপার কারণ আনিস।

আনিস একটা ঘটনা ঘটিয়েছে। ব্যাপারটা তার বাসায় মেনে নেবে না সেটা সে জানতো। তাও সে করেছে। সবচেয়ে বেশি রাগ হয়েছেন আনিসের বাবা। এমাজউদ্দীন সাহেব এক সময়ের নামকরা কার্ডিওলজিস্ট। তার রাগ ছিল বিখ্যাত। তার সামনে দাঁড়ালে যে কারোরই হার্ট দুর্বল হয়ে যেত, আর তার একজন সম্ভাব্য পেশেন্ট বাড়তো। বয়সের সাথে সাথে মানুষটা অনেক নরম হয়ে গেছে। তিনি এ ঘটনায় রাগ হবেন আনিস জানতো, তবে নরম মানুষটা এতটা গরম হবে, সেটা ভাবেনি।

বাইরের অবস্থা আঁচ করার জন্য আনিস দরজাটা অল্প ফাঁকা করে দাঁড়ালো। আনিসের বড়ো বোন শিউলি আপার গলা শোনা যাচ্ছে। শিউলি আপা আনিসের চেয়ে প্রায় নয় বছরের বড়ো হলেও আনিসের সাথে বন্ধুর মতোই তুই-তুই সম্পর্ক। আর যেকোনো তুই তুই সম্পর্কের মতোই তাদের ভেতরে ঝগড়াও লেগেই থাকে। তাদের কখন মিল কখন অমিল, সেটা বোঝা মুশকিল। তবে আজকের ঘটনার সময় তাদের ভেতর শান্তি বিরাজ করছে। এতে আনিসের সুবিধা হয়েছে। ঘটনা ঘটিয়ে আনিস প্রথমে জানিয়েছে শিউলি আপাকে। শিউলি আপা নিজেও ব্যাপারটা মেনে নিতে না পারলেও, damage control এর জন্য বাসায় এসে হাজির হয়েছে। এই মুহূর্তে সে সেই কাজটিই করার চেষ্টা করছে। এমাজউদ্দীন সাহেবের রাগ কমানোর চেষ্টা। শিউলি আপার গলা অল্প অল্প শোনা যাচ্ছে…….

“....বাবা ও তো কখনো খারাপ কিছু করেনি…..”

“....অবৈধ কিছু তো না, আনিস তো সব আইন মেনেই…..”

হঠাৎ করেই বজ্রপাতের মতো এমাজউদ্দীন সাহেবের হুঙ্কার শোনা গেলো “NO ! আমি কখনোই মেনে নিতে পারি না……”

নাহ, শিউলি আপাকে দিয়েও মনে হয় কাজ হচ্ছে না। আনিসের টেনশন বেড়ে গেলো। ঘামতে শুরু করেছে এসির মধ্যে।

আনিসের স্ত্রী নীলার অবস্থা আরও খারাপ। তার ভেতর এখন নানারকম চিন্তা এসে জমা হচ্ছে। দুশ্চিন্তা করা নীলার সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর মধ্যে একটা। তবে এখনকার অবস্থা একটু বেশিই খারাপ। তার দুশ্চিন্তার আরও বড় কারণ হচ্ছে, সে আনিসের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই জানতো।

আনিসের মা-ও আনিসের উপর কম রেগে নেই, তবে এই মুহূর্তে তার টেনশন এমাজউদ্দীন সাহেবের রাগ সামলানো নিয়ে। একটু পরে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন তিনি,

“ইশ! কি করলি তুই! এই নীলা! তুমি কিছু বলছো না কেন!”

“আমি কি বলব মা, আপনার ছেলেই তো…..”

“তার মানে তুমি ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছ!! আনিস বোকামি করতে পারে, ছেলে মানুষের মাথায় নানারকম ভীমরতি চাপে। কিন্তু তুমি ওর বৌ হয়ে এরকম একটা কাজ কিভাবে মাথা পেতে নিচ্ছ?”
নীলা মাথা নিচু করে আছে। আনিস দেখলো অল্প অল্প কাঁপছে সে। এখনো অবশ্য চোখের পানি বের হয়নি। তবে বেশি দেরি নেই।

“মা তোমরা কিন্তু overreact করছো”

“বড় বড় কথা বলিস না।…. তুই কি বাসায় নিয়ে এসেছিস …?”

“হমম"

“কোথায় এখন?”

“নিচে”

“ইশ, আমি দেখতেও চাইনা।… কি করলি তুই!”

যেমন এসেছিলেন তেমন ঝড়ের বেগেই বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

শিউলি আপা ঘরে ঢুকলেন চেহারা কালো করে। “অবস্থা সুবিধার না-রে। বাবা মেনে নিচ্ছেন না কোনোভাবেই। বলছে তুই নাকি সম্পর্কই নষ্ট করে দিলি।”

“কিন্তু এতটা ক্ষেপে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে? This is too much “

“তোকে বুঝতে হবে আনিস, এই ব্যাপারটা এই বাসায় কখনো ঘটবে কেউ কল্পনাও করেনি।….”

“এখন কি করবো?” আনিসের চোখে অসহায় ভাব স্পষ্ট।

“ঘর থেকে বের হোস না। চুপচাপ থাক। ”

শিউলি আপা চলে গেলেন।

ঘটনা প্রকাশের ২ ঘন্টা হয়ে গেলো। বাসার পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। আনিস নিজেকে সান্তনা দিতে লাগলো। সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে সব। সবাই মেনে নেবে। একটু সময় লাগবে এই যা।

------------------------------------------------------------------ 

রাত পেরিয়ে সকাল হলো। বাসার আবহাওয়া অপরিবর্তিত। টেনশন বুকে চেপেই অফিসে চলে গেলো আনিস। অফিসে গিয়ে কিছুক্ষন বসার পরেই ফোন বেজে উঠলো। কলারের নাম দেখে মুখ শুকিয়ে গেলো আনিসের। ছোট ফুফু ফোন করছে। এই ভদ্রমহিলা পরিবারের প্রতিটা মানুষকে জান দিয়ে ভালোবাসে। কিন্তু তার ভালোবাসার প্রকাশটা অধিকাংশ সময় ঝগড়া আর ধমকের মাধ্যমে হয়। আনিস এখন ভয়ঙ্কর রকমের ঝাড়ি খাবার প্রস্তুতি নিয়ে অফিস রুমের বাইরে গিয়ে ফোন ধরলো।

“আসসালামু আলাইকুম ফুফু!” (আনিস খুশি খুশি ভাব করে কথা বলার চেষ্টা করছে)

“ওয়ালাইকুম সালাম বাবা। সুখবর শুনলাম!”

ঝাড়ি খাওয়ার থেকেও বড় ধাক্কা খেলো আনিস। ছোট ফুফুও খুশি খুশি ভাবে কথা বলছে। ব্যাপার কি?

“জি ফুফু ….”

“আমি তো শুনেই আলহামদুলিল্লাহ বলেছি। নীলা রাগ টাগ করেনি তো?”

“না ও তো ঠিকই আছে….”

“বড় ভাইজান শুনলাম খুব রাগ। আরে এতো রাগ করার কি আছে! তারা আসলে আগে এরকম দেখেনিতো আমাদের সংসারে, তাই মেনে নিতে পারছে না আরকি।”

“জি ফুফু সেটাই।’

“আরে আমি তো জানিই। মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়াতে ওদের অনেকেরই দুটা তিনটাও থাকে। ওদের কাছে এটা খুবিই কমন।”

“জি”

“আমি ভাইজানকে বুঝাবো, তুই চিন্তা করিস না।”

“অনেক থ্যাংকস ফুফু”

“আর শোন, আমার বাসায় নিয়ে আয় একদিন। আমার কিন্তু দেখতে ইচ্ছা করছে!”

“ঠিক আছে নিয়ে আসবো”

“ঠিক আছে বাবা, কংগ্র্যাটস ! এনজয় ইওর লাইফ!”

পৃথিবীতে অনেক আজব ঘটনা ঘটে, তবে এরকম একটা ঘটনার পর ছোট ফুফুর খুশি হওয়ার মতো আজব ঘটনাও ঘটতে পারে, আনিসের জানা ছিল না।

খুশি মনে অফিসের ডেস্কে এসে বসলো আনিস। সকাল থেকে টেনশনে চা খেতে ভুলে গিয়েছিলো। এখন চা-এর কথা মনে পড়লো। অফিসের পিয়নকে ভালো করে এক কাপ চা নিয়ে আসতে বললো। পিয়ন যথারীতি গোমড়া মুখে চা আনতে গেলো। চা অফিসে রেডিই থাকে, তবে আনিসের চা আলাদা। সে খায় চিনি ছাড়া চা। সেজন্য পিয়নকে আনিসের চা আলাদা করে বানাতে হয়। তাই আনিস তার কাছে রীতিমতো অসহ্য।

বাসায় কি অবস্থা কে জানে। ছোট ফুফুর সাথে কথা বলার পর আনিসের মনে এখন আশার সঞ্চার হচ্ছে। হয়তো বাসার অবস্থাও উন্নতি হয়েছে। নীলাকে মেসেঞ্জারে নক করলো আনিস।

Me: bashar ki obostha??

Neela: bhalo na :(

Me: baba nasta korse?

Neela: hmm

Me: tumi table e chhila?

Neela: hmm. Unfortunately.

Me: kan ki hoise?

Neela: baba tana 15 minit amar dike chokh gorom kore takae chhilo, kono kotha bole nai.

Me: shit

Me: accha pore kotha hobe. Tension koiro na. Thik hoye jabe inshaAllah.

Neela: hmm

পিয়নটা চা দিয়ে গেছে। আনিস চায়ের কথা আবার ভুলে গেলো। মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। পানি খাওয়া দরকার। এই পরিস্থিতি কবে ঠিক হবে কে জানে? ভালো বিপদ হলো।

-------------------------------------------------------------------

ঠিক কি করেছে আনিস? সে কি দ্বিতীয় একটা বিয়ে করেছে?

নাহ। নীলাকে নিয়ে সে যথেষ্ট সুখে আছে। সে বিয়ের আগে পর্যন্ত শুনে এসেছে বৌ মানেই পেইন। তবে এই মেয়েটা একদম পেইন দেয় না। বরং তার জীবনের অনেক পেইন সে কমিয়ে দিয়েছে। এখন নতুন করে পেইনের সম্ভাবনা তৈরী করার কোনো ইচ্ছা আনিসের নেই।

তবে আনিস যেটা করেছে সেটা এই বাড়িতে দ্বিতীয় বিয়ের চেয়েও বেশি অগ্রহণযোগ্য। আরও অনেক বেশি দুঃসাহসিক।



আনিস একটা মোটরসাইকেল কিনেছে।



এতো কাহিনী এই অবাঞ্চিত মোটরসাইকেল নিয়েই। এই পরিবারের চৌদ্দ পুরুষ কেউ এই দুই চাক্কার বাহনটি চালায়নি। এদের কাছে মোটরসাইকেলে পা রাখা মানেই সেই পা ব্যান্ডেজে মোড়া অবস্থায় হাসপাতালে ঝুলছে। মোটরসাইকেল মানেই accident. ছোট খাটো না, বড় ধরণের।

আনিস মোটরসাইকেল চালানো শিখেছে মালয়েশিয়ায় পড়ার সময়। তখন থেকেই তার শখ দেশে ফিরে একটা বাইক কিনবে। বাসায় কয়েকবার বলেছে আনিস, কেউ রাজি হয়নি। এমাজউদ্দীন সাহেব ধমকেছেন কয়েকবার। আনিসের মেজো চাচা কিভাবে যেন জানতে পারলেন আনিস মোটরসাইকেল কিনতে চাচ্ছে। একদিন ফোন করেছিলেন আনিসকে। খুব অল্প কোথায় মনের ভাব প্রকাশ করেছিলেন চাচা।

“কিরে তুই নাকি মোটর সাইকেল কিনতে চাচ্ছিস?”

“জি চাচা”

“তুই মোটরসাইকেল কিনলে দুটা চাকা পাবি, কিন্তু তোর দুই পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব। বুঝেছিস?”

“জি চাচা”

আনিসের মোটরসাইকেল কেনার খবর তিনি এখনও মনে হয় পাননি। যদিও আনিস জানে আসলে কখনোই কেউ তাকে মারধর করবে না, তারপরও তার পা দুটা একটু যেন কেঁপে উঠলো।

-------------------------------------------------------------

বিকালের দিকে নীলা ফোন করলো আনিসকে। ভয়ে ভয়ে ফোন ধরলো আনিস, না জানি বাসায় আবার নতুন কি ঘটলো। তবে নীলার আওয়াজ পেয়েই বুঝলো খবর পজিটিভ। নীলা জানালো, একটু আগে এমাজউদ্দীন সাহেব নাকি ডেকেছিলেন নীলাকে….

“ছোট বৌ এদিকে এস!” গম্ভীর স্বরে ডাকলেন আনিসের বাবা।

“জি বাবা”

“আনিস ছাগলটা কি এখনও অফিসে?”

“জি”

“আসবে কখন?”

“এক ঘন্টার মধ্যেই আসার কথা”

“একটা জরুরি কথা শোন”

“জি বাবা বলেন….”

“আমি তোমার স্বামীকে ক্ষমা করে দিলাম”

নীলা কিছুই বলতে পারলো না। 

“ছাগলটাকে ফোন করে জানাও। নাহলে হয়তো ভয়ে বাসায় ঢুকবে না”

“আচ্ছা বাবা”

আনিসের আবার চায়ের কথা মনে পড়লো। সারাদিন সে চা না খেয়ে আছে কিভাবে? পিয়নটাকে ডাক দিলো আনিস। পিয়ন গোমড়া মুখে চা আনতে গেলো।

------------------------------------------------------------------

[বিঃ দ্রঃ গল্পের প্রতিটি চরিত্র ও যানবাহন কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা যানবাহনের সাথে মিলে গেলে তা অনভিপ্রেত কাকতালমাত্র]